জ্ঞানচক্ষু গল্প থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্তর

আশাপূর্ণা দেবী রচিত ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পটি পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের মাধ্যমিক সিলেবাস এর অন্তর্গত। এই জ্ঞানচক্ষু গল্পটি মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং এখান থেকে বেশ কিছু বড় প্রশ্ন ও সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন পরীক্ষায় প্রতি বছরই আসে।

জ্ঞানচক্ষু গল্প

এই লেখাটিতে, জ্ঞানচক্ষু গল্প থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এবং তার উত্তর দেওয়া হল। প্রতিটি প্রশ্নের কোন না কোন বছর মাধ্যমিক পরীক্ষায় এসেছে এবং আগামী বছর মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই জ্ঞানচক্ষু গল্পটি ভালো করে পড়ার পর এই প্রশ্নগুলি তোমরা অনুসরণ করতে পারো।

1. “পৃথিবীতে এমন অলৌকিক ঘটনাও ঘটে”- অলৌকিক ঘটনাটি কি? কার মধ্যে কেন এমন ভাবনার উদয় হয়েছিল? অলৌকিক ঘটনার আনন্দ উদ্দিষ্ট ব্যক্তি উপভোগ করতে পারেনি কেন?

আশাপূর্ণা দেবী রচিত “জ্ঞানচক্ষু” গল্পটিতে ছাপার অক্ষরে তপন কুমার রায়ের লেখা হাজার হাজার ছেলের হাতে ঘুরবে,এটাকেই অলৌকিক ঘটনা আখ্যা দেওয়া হয়েছে।

তপনের মধ্যে এমন ভাবনার উদয় হয়েছিল কারণ তাদের বাড়িতে বেড়াতে আসা ছোটো মাসি আর মেসোর হাতে সন্ধ্যতারা পত্রিকা দেখে তপনের প্রত্যাশা করেছিল হয়ত তার গল্প পত্রিকার সংখ্যায় ছাপা হয়েছে ও সেই গল্প এবার হাজার হাজার ছেলে পড়বে।

অলৌকিক ঘটনার আনন্দ উদ্দিষ্ট ব্যক্তি উপভোগ করতে পারেনি কারণ তপন যখন বাড়িতে সমবেত সকল আত্মীয়ের সামনে পত্রিকায় প্রকাশিত নিজের লেখা রচনা পাঠ করা শুরু করে , সে অবাক হয়ে লক্ষ্য করে যে তার গল্পের প্রত্যেকটি লাইন আনকোরা, পাকা হাতের কারসাজিতে ভরপুর। তপনের লেখার মৌলিকতা সেখানে খুঁজে পাওয়া ভার। শুধু তাই নয়, সেই নিজের নামে অন্যের ‘কারেকশান’ করে দেওয়া গল্প পাঠ করার পর সবাই যখন ধন্য ধন্য করে তখন তপন আর মেনে নিতে পারে না। তার মন ভেঙে যায়। তাই পত্রিকায় তার গল্প প্রকাশিত হলেও তপন সেই আনন্দ উপভোগ করতে পারে না।

2. “জ্ঞানচক্ষু” গল্পে জ্ঞানচক্ষু বলতে কি বোঝানো হয়েছে ? জ্ঞানচক্ষু গল্পটির নামকরণের সার্থকতা বিচার কর।

আশাপূর্ণা দেবী রচিত “জ্ঞানচক্ষু” গল্পটিতে জ্ঞানচক্ষু বলতে একজন মানুষের অন্তর্দৃষ্টির জাগরণকে বোঝানো হয়েছে। তপন জানত লেখক মানেই অন্যরকম মানুষ, আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মত নয়। তারা স্বপ্ন জগতের বাসিন্দা যাদের ছোঁয়া যায় না। কিন্তু তার নতুন মেসোমশাইকে দেখে তপন বুঝতে পারে যে সে কতটা ভুল ধারণার বশবর্তী ছিল। লেখকরা তাদের মতোই সাধারণ মানুষ,আকাশ থেকে পড়া কোনো জীব নয়। সেই মুহূর্তে লেখক সম্পর্কে তার জ্ঞানচক্ষু খুলে যায়। যদিও তপনের জ্ঞানচক্ষু প্রকৃতপক্ষে আরো পরে খুলেছিল।

যেকোনো সাহিত্যরচনার নামকরণ করা হয় তার বিষয়বস্তু, চরিত্র, ভাব বা ব্যঞ্জনা অনুযায়ী। যেকোনো সাহিত্য কর্মের ক্ষেত্রে তার নামকরণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। গল্পটির নামকরণ মূলত ব্যঞ্জনাধর্মী। জ্ঞানচক্ষু শব্দটির অর্থ হল অন্তর্দৃষ্টি। গল্পটিতে তপনের দুইবার জ্ঞানচক্ষু উন্মোচনের কথা বলা হয়েছে। প্রথমবার তা আপাত ক্ষনিকের জন্য হলেও পরবর্তীকালে যে জ্ঞানচক্ষু খুলেছিল তা যথেষ্ট ব্যঞ্জনাধর্মী। তপনের ধারণা ছিল লেখক আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মত নয়, তারা অন্যরকম, ধরা ছোঁয়ার বাইরে। কিন্তু নতুন মেসোমশাইকে দেখে তার জ্ঞানচক্ষু খুলে গেল অর্থাৎ লেখক যে আমাদের মতোই সাধারণ মানুষ তা তপন উপলব্ধি করতে পারল। পরবর্তীকালে তপন একটি গল্প লেখে এবং মেসোর সুবাদে সেই গল্প সন্ধ্যতারা পত্রিকায় ছাপাও হয়। কিন্তু বাড়িতে সমবেত সকল আত্মীয়ের সামনে গল্পটি পাঠ করতে গেলে সে চমকে ওঠে। তপন অবাক হয়ে দেখে যে সংশোধনের নামে তার নতুন মেসোমশাই লেখার মৌলিকতা পুরোটাই নষ্ট করে দিয়েছেন। তার কাঁচা হাতের লেখা পত্রিকায় লেখক মেসোর পাকার হাতের কারসজিতে পরিণত হয়েছে। নিজের লেখা পড়তে গিয়ে অন্যের লেখা পড়া ও ধন্য ধন্য শোনার মধ্যে দিয়ে তপনের সত্যিকারের অন্তর্দৃষ্টি জেগে ওঠে। সে সংকল্প করে নিজের লেখা সে নিজে পত্রিকার দফতরে জমা দিয়ে আসবে। তাতে তার লেখা ছাপা হলে ভালো , না ছাপা হলেও দুঃখ থাকবে না তার। অন্তত তার লেখার মৌলিকত্বের উপর অন্য কেউ কলম চালানোর চেষ্টা করবে না বা অন্য কারোর কৃতিত্ব ঘোষিত হবে না। নিজের নামে অন্যের লেখা পাঠ করার মধ্যে যে লজ্জা , অপমান তা তার সত্যিকারের জ্ঞানের দৃষ্টিকে জাগ্রত করে। এভাবেই তপনের আত্মমর্যাদাবোধের জাগরণের মধ্য দিয়ে তপনের জ্ঞানচক্ষুর উন্মেষ ঘটেছে। তাই বলা যায় জ্ঞানচক্ষু নামকরণটি যথাযথ ও সার্থক হয়েছে।

3. গল্পটিতে তপনের চরিত্র বিশ্লেষণ কর। কোন কথা শুনে তপনের চোখ মার্বেল হয়ে গেল এবং কেন? মার্বেল হয়ে গেল কথাটির অর্থ কি?

আশাপূর্ণা দেবীর “জ্ঞানচক্ষু” গল্পটিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হল তপন। সমগ্র গল্পটি জুড়ে তপনের যে মানসিক চিন্তাধারা,কল্পনার,স্বতন্ত্র ব্যক্তিসত্তার বিকাশ হয়েছে তা এই গল্পটিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। সমগ্র গল্পটিতে তপনের চরিত্রের বিভিন্ন দিক সুন্দর করে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। গল্পটির প্রথমে তপনের কল্পনাপ্রবনতার দিকটি রুলে ধরা হয়েছে। তপন ভাবত যে লেখক আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মত নয়, তারা ভিন্ন। তারা অন্য লোকের বাসিন্দা, ধরা ছোঁয়ার বাইরে।কিন্তু পরবর্তীতে নতুন মেসকে দেখে সে উপলব্ধি করল যে লেখকরাও আমাদের মতোই সাধারণ মানুষ। লেখক সম্পর্কে তপনের জ্ঞানচক্ষু উন্মোচনের দিকটি দেখানো হয়েছে এখানে। নতুন মেসকে দেখার পর রোপন যখন উপলব্ধি করতে পারল যে লেখকরাও সাধারণ মানুষ ও খুব সহজেই লেখা যায় তখন তপনের মধ্যে সৃজনশীল সত্তা জেগে উঠল। দুপুর বেলায় সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে তখন তপন একটি আস্ত গল্প লিখে ফেলল। শুধু তাই নয় ,কয়েকদিনের মধ্যে সে আরো দু’তিনটে গল্প লিখে ফেলল।এর কিছুদিন পরেই যখন তপন দেখে তার লেখা একটি গল্প সন্ধ্যতারা পত্রিকায় ছাপা হয়েছে সে আনন্দে ডগমগ হয়ে ওঠে কিন্তু সকলের সামনে সেই লেখা পাঠ করতে গেলে সে হতচকিত হয়ে পড়ে। তপন খেয়াল করে যে সংশোধনের নামে তার গল্পটা পুরোপুরি অন্যের লেখায় পরিণত হয়েছে , তপনের লেখার মৌলিকত্বের কোনো অবশিষ্ট ই সেখানে নেই। লজ্জায় অপমানে তপনের অন্তর ভেঙে খানখান হয়ে গেলেও এই ঘটনার মধ্যে দিয়ে তপনের সত্যিকারের জ্ঞানচক্ষুর উন্মেষ হয়। তপন সিঙ্কল্প করে নিজের লেখা সে এবার থেকে নিজেই পত্রিকার সম্পাদকের কাছে জমা দিয়ে আসবে তাতে তার লেখা ছাপা হোক বা না হোক। এই ঘটনার মধ্যে দিয়ে তপনের আত্মসম্মানবোধ জাগরিত হয়। সমগ্র গল্পটির মধ্যে দিয়ে এভাবেই তপনের চরিত্রের বিভিন্ন দিক উন্মোচিত হয়েছে।

তপনের ছোটোমাসীর সঙ্গে যার বিয়ে হয়েছে সেই নতুন মেসোমশাই একজন জলজ্যান্ত লেখক এই কথাটা শুনে তপনের চোখ মার্বেল হয়ে গেল।

তপনের নতুন মেসোমশাই একজন লেখক , তার অনেক বই ছাপা হয়েছে। তপন জানত লেখকরা সাধারণ মানুষের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়। তারা দূর স্বপ্নলোকের বাসিন্দা। কিন্তু সেই ভিন্ন জগতের বাসিন্দা তার মেসো ও তাকে সামনে থেকে দেখা তপনের কাছে প্রায় স্বপ্নপূরণের সামিল। তাই তপনের চোখ মার্বেল হয়ে গেছিল।

মার্বেল হয়ে গেল কথাটি বলতে এখানে অবাক হয়ে যাওয়াকে বোঝানো হয়েছে। তপনের মেসো যে একজন লেখক এই কথা জানার পর বিস্ময়ে তপনের চোখ বড়বড় হয়ে যায়। সেই কথা বোঝাতে মার্বেল হয়ে যাওয়া বলা হয়েছে। কারণ মার্বেল পাথর গোলগোল হয়। তপনের চোখও বিস্ময়ে গোলগোল হয়ে গেছিল। মার্বেলের সাথে তুলনা করেই এখানে তপনের গোলগোল চোখকে মার্বেল হয়ে গেল বোঝানো হয়েছে।

4. “তপন আর পড়তে পারে না। বোবার মতো বসে থাকে”– তপনের এরকম অবস্থার কারণ কি?

আশাপূর্ণা দেবীর “জ্ঞানচক্ষু” গল্পে তপনের এরকম অবস্থার কারণ হল তপনের লেখা গল্প সন্ধ্যাতারা পত্রিকায় তার নতুন মেসোর সুবাদে প্রকাশিত হয়েছে। বাড়িতে সকলের সামনে তপন যখন নিজের লেখা গল্প কিছুটা পাঠ করে তখন সে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায়। কারণ তপন দেখে তার কাঁচা হাতের লেখা লেখক মেসোর পাকা হাতের কারসজিতে পরিণত হয়েছে। সেই লেখার মধ্যে তপন আর নিজেকে খুঁজে পাচ্ছিল না। সেই গল্পে তপনের মৌলিকত্ব সম্পুর্ন বিনষ্ট হয়ে গেছিল। নিজের নামে মেসোর ‘কারেকশান’ করে দেওয়া প্রায় সম্পূর্ণ নতুন একটি লেখা তাই আর তপন পড়তে পারে না, ঘটনার আচম্বিতে সে বোবার মত বসে থাকে।

জ্ঞানচক্ষু গল্প থেকে এই ছিল বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্তর। এইসব প্রশ্ন গুলি মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই গল্প সংক্রান্ত যে তোমাদের কোন প্রশ্ন থাকে তাহলে নিচের কমেন্ট বক্সে তা লিখে জানাতে পারো।

Recommend for you

Leave a Comment